ঢাকার মোবাইল মার্কেটগুলোতে সম্প্রতি এক অদ্ভুত প্রবণতা চোখে পড়ছে। সারাদিন দোকানে ভিড় জমাচ্ছেন আইফোন ব্যবহারকারীরা—কেউ চার্জ না থাকা, কেউ হঠাৎ কান্ট্রিলক হয়ে যাওয়া, কেউ আবার ডিসপ্লে বার্নিং বা ব্যাটারি হেলথ নষ্ট হওয়ার অভিযোগ নিয়ে ছুটছেন টেকনিশিয়ানদের কাছে।
মোবাইল সার্ভিসিং দোকানগুলোর টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ফোনগুলোর বেশিরভাগই আসলে রিফার্বিশড বা ব্যবহৃত আইফোন—যেগুলো নতুনের মতো করে প্যাকেজিং করে বাংলাদেশে বিক্রি হচ্ছে। অল্প দামে “অরিজিনাল” আইফোনের লোভে পড়ে ক্রেতারা কিনছেন এসব ফোন, কিন্তু কিছুদিন ব্যবহারের পরই পড়ছেন ভয়াবহ সমস্যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ফোনগুলোর একটি বড় অংশ আসে দুবাই থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন নির্মাণ, প্রজেক্ট বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত আইফোনগুলো নির্দিষ্ট সময় পর বাতিল করা হয়। এরপর বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে সেগুলো নিলাম বা পাইকারি বিক্রির মাধ্যমে চলে আসে পুনর্ব্যবহারের বাজারে।
এই পুরনো বা নষ্ট আইফোনগুলোকে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কিনে এনে চীনে বা হংকংয়ে রিফার্বিশড করান—অর্থাৎ পুরনো ফোনে নতুন কভার, ব্যাটারি বা স্ক্রিন লাগিয়ে নতুনের মতো করে তোলা হয়। এরপর “অরিজিনাল, ইউরোপিয়ান ভার্সন, বা ফ্যাক্টরি আনলক” ট্যাগ দিয়ে তা বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
দেশে পৌঁছানোর পর অবৈধ চ্যানেলে ফোনগুলো ঢুকে পড়ে মোবাইল মার্কেটের দোকানগুলোতে—বিশেষ করে ঢাকার বসুন্ধরা সিটি, মোবাইল বাজার, চাঁনখারপুল ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের দোকানগুলোতে। এখানে ফোনগুলো আবার নতুন বক্সে প্যাকেজিং করে “নতুন আইফোন” হিসেবে বিক্রি হয়।
এই রিফার্বিশড আইফোনগুলো কেনার সময় অনেকেই ব্যাটারি হেলথ ৯০–৯৮% দেখিয়ে নিশ্চিন্ত হন। কিন্তু বাস্তবে এসব ডেটা সফটওয়্যার মডিফাই করা থাকে। এক-দুই মাসের মধ্যে ফোনের ব্যাটারি হঠাৎ দ্রুত ড্রেইন হয়, চার্জ থাকে না, আবার অনেক সময় হুট করে ফোন কান্ট্রিলক বা অ্যাক্টিভেশন লকড হয়ে যায়।
টেকনিশিয়ানদের ভাষায়, “এসব ফোনের ভেতরে আগে থেকেই অ্যাপল আইডি বা প্রজেক্ট প্রোফাইল সেট করা থাকে। ফোনটা বাংলাদেশে নতুনভাবে সেটআপ করা হলেও কিছুদিন পর সেই প্রোফাইল অ্যাকটিভ হয়ে ফোনটা লক করে দেয়।”
এমন সমস্যায় পড়া অনেক ক্রেতা শেষমেশ বাধ্য হন ফোন পরিবর্তন করতে—যার মানে পুরো টাকা নষ্ট।
ঢাকার কয়েকটি জনপ্রিয় মোবাইল সার্ভিস সেন্টার জানিয়েছে, বর্তমানে আইফোন সার্ভিসিং কাস্টমারের প্রায় ৭০% আসছেন এই রিফার্বিশড বা ইউজড ফোন নিয়ে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক ফোন সার্ভিসযোগ্য নয়, কারণ অ্যাপল সিস্টেমে কান্ট্রিলক থাকলে তা আনলক করার কোনো বৈধ উপায় নেই।
একজন টেকনিশিয়ান বলেন, “অনেকে ফোন কিনে দুই সপ্তাহ পরই নিয়ে আসেন। আমরা ব্যাটারি বা ডিসপ্লে ঠিক করে দিতে পারি, কিন্তু সফটওয়্যার লক থাকলে কিছুই করার থাকে না। তখন ক্রেতা বুঝতে পারেন, তিনি যে ‘নতুন আইফোন’ কিনেছিলেন, সেটি আসলে পুরনো প্রজেক্ট ফোন।”
বিটিআরসি ও কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, প্রতি মাসে শত শত রিফার্বিশড আইফোন অবৈধভাবে দেশে ঢুকছে। এগুলোর বেশিরভাগই আসে কুরিয়ার বা লাগেজ পার্টি হিসেবে, যেগুলো সরকারি নিবন্ধন বা শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই বাজারে বিক্রি হয়।
এই অবৈধ বাজারের পরিমাণ বছরে কয়েকশো কোটি টাকার সমান, এবং সরকার এতে বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় মোবাইল উৎপাদন শিল্পও পড়ছে বড় সংকটে, কারণ অবৈধভাবে আনা এই ডিভাইসগুলো দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রিতে প্রভাব ফেলছে।
এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) আবারও চালু করতে যাচ্ছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR)।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবসে, এই সিস্টেমটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে। এর মাধ্যমে দেশের নেটওয়ার্কে সংযুক্ত প্রতিটি হ্যান্ডসেটের IMEI নম্বর রিয়েল-টাইমে যাচাই করা হবে। কোনো ফোন যদি অবৈধ, ক্লোন বা অচিহ্নিত IMEI-সহ থাকে, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হয়ে যাবে এবং নেটওয়ার্কে কাজ করবে না।
উল্লেখ্য, NEIR ২০২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হলেও, কিছু প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এবার আধুনিক প্রযুক্তিতে আপগ্রেড করা নতুন সিস্টেমে তা স্থায়ীভাবে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিটিআরসি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, NEIR চালু হলে অবৈধভাবে আমদানি হওয়া এই “দুবাই ফেরত রিফার্বিশড ফোন” বাজার অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে। এতে সরকার রাজস্ব আয় বাড়াবে এবং ক্রেতারাও আসল ও নিরাপদ ফোন ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইফোন কেনার আগে অবশ্যই IMEI যাচাই, অ্যাক্টিভেশন স্ট্যাটাস, এবং ওয়ারেন্টি চেক করা জরুরি। সবচেয়ে ভালো হয় যদি ফোনটি অফিসিয়াল রিটেইলার বা অনুমোদিত দোকান থেকে কেনা হয়।
যে কোনো ফোনে যদি দাম “অস্বাভাবিকভাবে কম” মনে হয়, তবে সেটি সন্দেহজনক হতে পারে। কারণ আসল পণ্য কখনোই বাজারদরের তুলনায় অর্ধেক দামে বিক্রি হয় না।
দুবাই থেকে আসা ব্যবহৃত আইফোনগুলোর পুনর্বিক্রির এই চক্র এখন বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, অথচ অনেকেই তা বুঝতেও পারছেন না।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর NEIR চালুর মধ্য দিয়ে হয়তো শুরু হতে যাচ্ছে অবৈধ ফোনবিরোধী এক নতুন অধ্যায়। এখন শুধু প্রয়োজন কঠোর নজরদারি ও গ্রাহক সচেতনতা—যাতে “নতুনের মতো” প্যাকেজিংয়ের মোহে পড়ে আর কেউ পুরনো প্রতারণার শিকার না হয়।
The post দুবাই ফেরত আইফোনের ফাঁদে বাংলাদেশি ক্রেতারা appeared first on Techzoom.TV.

0 Comments