চট্টগ্রামের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী রিয়াজউদ্দিন বাজার একসময় ছিল দেশের পাইকারি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সততা ও বিশ্বস্ততার জন্য এই বাজারের সুনাম ছিল দেশজুড়ে। কিন্তু সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এখন ম্লান হতে বসেছে। কতিপয় অসাধু মোবাইল ব্যবসায়ী এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে রিয়াজউদ্দিন বাজার এখন পরিচিতি পেয়েছে ‘চোরাই ফোনের স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাজারের তামাকুমুণ্ডি লেন, জলসা মার্কেট, রিজওয়ান কমপ্লেক্সসহ একাধিক মার্কেটে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ভারত থেকে চুরি হয়ে আসা এবং শুল্ক ফাঁকি দেওয়া অবৈধ মোবাইল ফোন। এতে একদিকে সরকার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ক্ষুণ্ন হচ্ছে বাজারের সুনাম।
ঐতিহ্যে ‘কালিমা’ লেপনকারী সিন্ডিকেট সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারের এই অধপতনের মূল কারণ তমাকুণ্ড লাইন মোবাইল ব্যবসায়ী সমিতি এবং চট্টগ্রাম মেট্রো মোবাইল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আরিফুর রহমান ও তার নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট।
অভিযোগ রয়েছে, আরিফুর রহমান তার রাজনৈতিক প্রভাব (সাবেক আ.লীগ কানেকশন) ব্যবহার করে এই বাজারকে চোরাই ফোনের ‘ট্রানজিট রুট’ বানিয়েছেন। ভারত থেকে চুরি হওয়া আইফোনগুলো রাশেদ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এখানে আসে এবং এখান থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। আবার দেশ থেকে চুরি হওয়া ফোনগুলো এখান থেকেই আইএমইআই (IMEI) বদলে বিদেশে পাচার করা হয়।
চোরাই ফোনের এই রমরমা ব্যবসার কারণে সাধারণ ক্রেতারা ভয়াবহ বিপদে পড়ছেন। সম্প্রতি রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে কেনা আইফোন নিয়ে ভারতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন শাহ আলম নামের এক বাংলাদেশি। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসার পর রিয়াজউদ্দিন বাজারের নাম জড়িয়ে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
বাজারের প্রবীণ এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে এখানে ব্যবসা করছি। আগে মানুষ শ্রদ্ধার সাথে রিয়াজউদ্দিন বাজারের নাম নিত। আর এখন মানুষ বলে, ওটা তো চোরের বাজার। মুষ্টিমেয় কিছু অপরাধীর জন্য আমাদের মতো হাজারো সৎ ব্যবসায়ীর সম্মান ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাজারের অলিগলিতে গড়ে উঠেছে কয়েকশো মোবাইল মেরামতের দোকান, যা মূলত আইএমইআই পরিবর্তনের ল্যাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মাত্র কয়েক শ টাকার বিনিময়ে ৫-১০ সেকেন্ডের মধ্যে ফোনের পরিচয় বদলে ফেলা হয়। প্রশাসনের নাকের ডগাতেই চলছে এই অবৈধ কর্মযজ্ঞ।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর (NEIR) চালু হলে এই অবৈধ কারবার বন্ধ হয়ে যাবে—এই ভয়ে আরিফুর রহমানের সিন্ডিকেট এখন বাজার অস্থিতিশীল করার হুমকি দিচ্ছে। তারা সাধারণ ব্যবসায়ীদের ভুল বুঝিয়ে ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে সচেতন মহল ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, রিয়াজউদ্দিন বাজারের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই এই মাফিয়া সিন্ডিকেটকে উৎখাত করতে হবে। চোরাই ও অবৈধ ফোনের অভিশাপ থেকে বাজারকে মুক্ত করতে প্রশাসনের কঠোর অভিযানের দাবি জানিয়েছেন তারা।
The post ঐতিহ্যবাহী রিয়াজউদ্দিন বাজার এখন ‘চোরাই ফোনের আড়ত’: মাফিয়া সিন্ডিকেটের কবলে ধুলিস্যাৎ শতবর্ষের সুনাম appeared first on Techzoom.TV.

0 Comments