আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর (NEIR) চালুর ঘোষণাকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ মহল প্রচার চালাচ্ছে যে, সরকারের উদ্দেশ্য শুধুই রাজস্ব আদায়। কিন্তু প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, এনইআইআর কেবল রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল নয়, বরং এটি অনলাইন জুয়া, হুন্ডি, এমএফএস প্রতারণা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ‘মহা-রক্ষাকবচ’।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এনইআইআর একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সিকিউরিটি ইকো-সিস্টেম’। এটি কার্যকর হলে অপরাধীরা চাইলেও প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারবে না।
অনলাইন জুয়া ও হুন্ডির টুঁটি চেপে ধরবে বর্তমানে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের সবচেয়ে বড় মাধ্যম অনলাইন জুয়া ও হুন্ডি। অপরাধীরা এই কাজে ব্যবহার করে অনিবন্ধিত বা ‘ক্লোন আইএমইআই’ যুক্ত স্মার্টফোন। যেহেতু এসব ফোনের কোনো বৈধ মালিকানা বা ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট থাকে না, তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহজে তাদের ট্রেস করতে পারে না।
এনইআইআর চালু হলে প্রতিটি হ্যান্ডসেট ব্যবহারকারীর এনআইডি (NID) এবং বায়োমেট্রিক সিমের সঙ্গে ম্যাপ করা থাকবে। ফলে অবৈধ ফোনে জুয়া খেলা বা হুন্ডির লেনদেন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। ডিজিটাল লেনদেনের প্রতিটি ধাপ শনাক্তযোগ্য হওয়ায় মানিলন্ডারিংয়ের এই বিশাল রুটটি বন্ধ হয়ে যাবে।
এমএফএস প্রতারণা ও গরিবের টাকা রক্ষা বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে আসা গরিবের সরকারি ভাতার টাকা, বয়স্ক ভাতা কিংবা শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা প্রায়ই প্রতারক চক্র হাতিয়ে নেয়। এই ‘হ্যালো পার্টি’ বা প্রতারকরা সাধারণত ‘ওয়ান টাইম’ বা অনিবন্ধিত ফোন ব্যবহার করে, যা অপরাধের পর ফেলে দেওয়া হয়। এনইআইআর ব্যবস্থায় প্রতিটি ফোন ট্রেস করা যাবে। ফলে প্রতারকরা ধরা পড়ার ভয়ে এসব অপরাধ থেকে পিছু হটতে বাধ্য হবে।
তথ্য সন্ত্রাস ও ব্ল্যাকমেইলিং নিয়ন্ত্রণ ফোনে অজ্ঞাত পরিচয়ে হুমকি দেওয়া, চাঁদা দাবি করা, নারীদের উত্ত্যক্ত করা বা গুজব ছড়ানোর মতো ‘তথ্য সন্ত্রাস’ দমনে এনইআইআর অত্যন্ত কার্যকর। বর্তমানে সিম বদলালেও অপরাধীরা একই হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে অপরাধ চালিয়ে যায়। এনইআইআর চালু হলে হ্যান্ডসেটটিই নজরদারির আওতায় আসবে। ফলে অপরাধী সিম বদলালেও হ্যান্ডসেটের আইএমইআই (IMEI) ট্র্যাক করে তাকে ধরা সহজ হবে।
মোবাইল চুরি হবে অতীত ইতিহাস আপনার শখের মোবাইলটি চুরি হলে এখন আর পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না কারণ চোরেরা ৫ সেকেন্ডেই আইএমইআই বদলে ফেলে। কিন্তু এনইআইআর চালু হলে চুরি হওয়া ফোনটি বিটিআরসি’র সার্ভার থেকে ‘লক’ করে দেওয়া যাবে। ফোনটি তখন ‘খেলনা’ বা অকেজো হয়ে যাবে। চোরেরা আইএমইআই বদলালেও নেটওয়ার্ক তা গ্রহণ করবে না। ফলে চুরির মোটিভ বা উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়ে যাবে।
২০ হাজার কোটি টাকার সিন্ডিকেটের ভয় এনইআইআর জননিরাপত্তার জন্য এত জরুরি হওয়া সত্ত্বেও কেন এর বিরোধিতা করা হচ্ছে? অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের অবৈধ মোবাইল বাজারের আকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এনইআইআর চালু হলে তাদের অবৈধ ও রিফারবিশড ফোনের ব্যবসা ধসে পড়বে। তাই তারা ‘রাজস্বের দোহাই’ দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
এনইআইআর বাস্তবায়নের বিষয়টি এখন আর শুধু প্রযুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। একটি নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে এবং সাধারণ মানুষের কষ্টের টাকা বাঁচাতে এনইআইআর-এর কোনো বিকল্প নেই। যারা এর বিরোধিতা করছে, তারা পরোক্ষভাবে অপরাধীদেরই সুরক্ষা দিতে চাইছে।
The post জুয়া, হুন্ডি ও প্রতারণা বন্ধের চাবিকাঠি এনইআইআর: শুধু রাজস্ব নয়, নিশ্চিত হবে জাতীয় নিরাপত্তা appeared first on Techzoom.TV.

0 Comments