অর্থ পাচারের সবচেয়ে ‘সহজ মাধ্যম’ এখন মোবাইল ব্যবসা

আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার নতুন কিছু নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতিবাজ ও পাচারকারীদের কাছে অর্থ পাচারের সবচেয়ে সহজ এবং নিরাপদ রুট হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মোবাইল ফোন ও গ্যাজেট ব্যবসা’। ছোট আকারের পণ্য কিন্তু দাম আকাশচুম্বী—এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সিন্ডিকেটগুলো প্রতি বছর দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে। মোবাইল ব্যবসার আড়ালে মূলত তিনটি কৌশলে চলছে এই অর্থ পাচারের মহোৎসব।

কৌশল ১: আন্ডার ইনভয়েসিং ও হুন্ডি সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয় আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে।

পদ্ধতি: একজন আমদানিকারক চীন বা দুবাই থেকে ১০০০ ডলারের একটি আইফোন বা প্রিমিয়াম ফোন কিনছেন। কিন্তু কাস্টমসে ঘোষণা দিচ্ছেন, তিনি ২০০ ডলারের পণ্য এনেছেন অথবা একে ‘মোবাইল পার্টস’ বা ‘ডেমো ইউনিট’ হিসেবে দেখাচ্ছেন।

পাচার: ব্যাংকিং চ্যানেলে তিনি ২০০ ডলার পাঠাচ্ছেন। বাকি ৮০০ ডলার তিনি অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে বিক্রেতার কাছে পাঠাচ্ছেন। এই হুন্ডির টাকা যাচ্ছে মূলত রেমিট্যান্স প্রবাহ আটকে দিয়ে বা দেশ থেকে ডলার কিনে।

কৌশল ২: লাগেজ পার্টি ও ‘হ্যান্ড ক্যারি’ মোবাইল সিন্ডিকেটের একটি বড় অংশ এলসি (LC) খোলার ঝামেলাতেই যায় না। তারা ‘লাগেজ পার্টি’ ব্যবহার করে।

পদ্ধতি: প্রতিদিন শত শত বাহক বা ক্যারিয়ার দুবাই, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড থেকে লাগেজে করে দামী ফোন নিয়ে আসছেন। এর বিপরীতে কোনো বৈধ ব্যাংকিং লেনদেন হয় না। পুরোটাই হুন্ডিতে পেমেন্ট করা হয়।

ফলাফল: দেশে পণ্য ঢুকছে, বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু সরকার জানছে না এই পণ্যের টাকা কীভাবে পরিশোধ হলো। এটি সরাসরি দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

কৌশল ৩: রিফারবিশড ও ক্লোন ফোনের ব্যবসা দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘ড্যাজেল’ বা ‘সুমাস টেক’-এর মতো সিন্ডিকেটগুলো বিদেশ থেকে রিফারবিশড (পুরোনো ফোন মেরামত করা) বা ক্লোন ফোন আনে, যার প্রকৃত মূল্য খুবই কম। কিন্তু দেশে এনে সেগুলোকে ‘অফিসিয়াল’ বা ‘নতুন’ বলে চড়া দামে বিক্রি করে।

লাভ ও পাচার: এই প্রক্রিয়ায় তারা দ্বিমুখী লাভ করে। কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করে এবং সেই বাড়তি মুনাফা আবার বিদেশে পাচার করে দুবাই বা ইউরোপে সম্পদ গড়ে তোলে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মোবাইল ব্যবসার আড়ালে পাচার করা অর্থের বড় একটি অংশ জমা হচ্ছে দুবাইয়ে। সেখানে মোবাইল সিন্ডিকেটের গডফাদাররা রিয়েল এস্টেট এবং স্বর্ণ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। অভিযোগ রয়েছে, দিদারুল ইসলাম খান ও আবু সাঈদ পিয়াসের মতো ব্যবসায়ীরা এই পাচারকৃত অর্থে বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন নিশ্চিত করেছেন এবং সেখান থেকেই দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মোবাইল ফোন এমন একটি পণ্য যা সহজে বহনযোগ্য এবং তরল টাকার মতো বিনিময়যোগ্য। তাই কালো টাকা সাদা করতে এবং বিদেশে পাচার করতে এটি এখন মাফিয়াদের পছন্দের শীর্ষে। এনইআইআর (NEIR) বা আইএমইআই নিবন্ধন কড়াকড়ি না করলে এই পাচার থামানো অসম্ভব। কারণ অবৈধ ফোনের বাজার যত বড় হবে, হুন্ডির চাহিদাও তত বাড়বে।

ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং এনবিআর এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মোবাইল আমদানিতে স্বচ্ছতা আনতে এবং হুন্ডি বন্ধ করতে ২০ জন শীর্ষ ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব তলব এবং এনইআইআর বাস্তবায়নে অনড় থাকার সিদ্ধান্ত মূলত এই অর্থ পাচার ঠেকানোরই অংশ।

The post অর্থ পাচারের সবচেয়ে ‘সহজ মাধ্যম’ এখন মোবাইল ব্যবসা appeared first on Techzoom.TV.

Post a Comment

0 Comments