মোবাইল শিল্পে শৃঙ্খলার অভাব: নেপথ্যে কি তবে ভারতের বাজার দখলের ‘নীল নকশা’?

বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ এখন অবৈধ বা চোরাই হ্যান্ডসেটের দখলে। সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চোরাই ফোনের বড় একটি অংশ প্রতিবেশী ভারত থেকে সীমান্ত পেরিয়ে আসছে। ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল উৎপাদনকারী এবং তাদের হাতে প্রচুর উদ্বৃত্ত পণ্য (Surplus Stock) থাকে। বাংলাদেশে বৈধ আমদানিতে প্রায় ৪১-৬০ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়, কিন্তু অবৈধ পথে আসা ফোনে কোনো শুল্ক নেই।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, অবৈধ মোবাইল বাজারের এই প্রসার প্রকারান্তরে ভারতীয় কারখানাকেই লাভবান করছে। কারণ, বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প সংকটে পড়লে বাজারটি সম্পূর্ণভাবে বিদেশি পণ্যের, বিশেষ করে ভারতীয় পণ্যের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে।

এনইআইআর (NEIR) নিয়ে ধোঁয়াশা ও ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ
অবৈধ ফোন বন্ধে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (NEIR) বা মোবাইল নিবন্ধন পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দেওয়া হলেও এর বাস্তবায়ন বারবার পেছাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৬ ডিসেম্বরের পরিবর্তে এই ব্যবস্থা চালুর সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই এনইআইআর ব্যবস্থা নিয়ে অবৈধ ফোন ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র বিভাজন ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। অবৈধ ফোন ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এনইআইআর-এর মতো কঠোর প্রযুক্তি চালু করলে খুচরা বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে এবং অনেক ছোট ব্যবসায়ী পুঁজি হারাবে। অন্যদিকে, বৈধ উৎপাদকরা বলছেন, এই সিস্টেম চালু না হলে চোরাই ফোন বন্ধ হবে না।

কেন বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো ভারত যাচ্ছে, বাংলাদেশ নয়?
বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি (যেমন অ্যাপল, গুগল, স্যামসাং) ভারতে ফ্যাক্টরি দিলেও বাংলাদেশে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

শুল্ক কাঠামোয় অস্থিরতা: বাংলাদেশে বৈধ আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব চলছে, যা স্থানীয় কারখানার বিনিয়োগকে হুমকির মুখে ফেলছে। এনবিআর চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, তারা আমদানি ও উৎপাদন দুই ক্ষেত্রেই কর ছাড়ের চিন্তা করছেন যাতে ভারসাম্য বজায় থাকে।

অবকাঠামো ও বাজার: ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজার বিশাল এবং তারা ইউরোপ-আমেরিকায় ফোন পাঠানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করেছে।

বর্তমান সংকট ও এনবিআরের পদক্ষেপ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) সম্প্রতি সুমশ টেক-এর মালিক আবু সাঈদ পিয়াসের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে। তার বিরুদ্ধে হুন্ডি, চোরাচালান এবং ‘লাগেজ পার্টি’র মাধ্যমে অবৈধ ফোন এনে কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোর ধারণা, এই অবৈধ চক্রের কারণেই দেশীয় শিল্প বিকশিত হতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সরকার দ্রুত এনইআইআর ব্যবস্থা কার্যকর করে চোরাই ফোনের বাজার বন্ধ না করে এবং স্থানীয় উৎপাদকদের ভারতের মতো রপ্তানি সুবিধা না দেয়, তবে বাংলাদেশের মোবাইল কারখানাগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

The post মোবাইল শিল্পে শৃঙ্খলার অভাব: নেপথ্যে কি তবে ভারতের বাজার দখলের ‘নীল নকশা’? appeared first on Techzoom.TV.

Post a Comment

0 Comments