কয়েক বছর আগেও ফোনে ছবি সম্পাদনার অর্থ ছিল কেবল আলো বা রঙের সামান্য পরিবর্তন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে যুক্ত হয়েছে জেনারেটিভ এআই। এখন ছবিতে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ব্যক্তিকে সরিয়ে ফেলা, মেঘহীন আকাশে চমৎকার গোধূলি যোগ করা কিংবা ফ্যাকাশে চেহারায় কৃত্রিম সজীবতা আনা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার
স্মৃতি এখন আর শুধু মনের মণিকোঠায় জমা থাকা অনুভূতি নয়, বরং পকেটে থাকা স্মার্টফোনের অ্যালগরিদমের হাতে বন্দি থাকা এর ডিজিটাল সংস্করণ। আধুনিক স্মার্টফোন এখন পরোক্ষভাবে ঠিক করে দিচ্ছে মানুষের স্মৃতির রূপ ও রং কেমন হবে। এক সময় ছবি তোলা হতো মুহূর্তকে ফ্রেমবন্দি করার জন্য। আর এখন ছবি তোলা হচ্ছে সেই মুহূর্তকে কৃত্রিমভাবে ‘নিখুঁত’ করার জন্য।
কয়েক বছর আগেও ফোনে ছবি সম্পাদনার অর্থ ছিল কেবল আলো বা রঙের সামান্য পরিবর্তন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে যুক্ত হয়েছে জেনারেটিভ এআই। এখন ছবিতে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ব্যক্তিকে সরিয়ে ফেলা, মেঘহীন আকাশে চমৎকার গোধূলি যোগ করা কিংবা ফ্যাকাশে চেহারায় কৃত্রিম সজীবতা আনা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার।
এসব পরিবর্তনের ফল চোখে পড়ার মতো হলেও তা ধীরে ধীরে বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রভাবিত করছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
স্মার্টফোন দিয়ে চাঁদের ছবি তুলতে গিয়ে ঝাপসা বা অস্পষ্ট ফল পাওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু স্যামসাং গ্যালাক্সি ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। এ ফোনের ‘১০০এক্স স্পেস জুম’ ফিচারে তোলা চাঁদের ছবি এতটাই স্বচ্ছ যে, তা রীতিমতো পেশাদার টেলিস্কোপের পাল্লা দেয়। তবে সম্প্রতি রেডিট ব্যবহারকারীদের এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, স্যামসাংয়ের এ চাঁদের ছবিগুলো আসলে শতভাগ আসল নয়।
এক ব্যবহারকারী তার কম্পিউটারের স্ক্রিনে চাঁদের একটি অত্যন্ত ঝাপসা ও নিম্নমানের ছবি প্রদর্শন করেন। এরপর তিনি স্যামসাং ফোন দিয়ে সেই ঝাপসা স্ক্রিনের ছবি তোলেন। অবাক করা বিষয় হলো, ফোনের স্ক্রিনে যে ছবিটি ফুটে ওঠে তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও তাতে এমন সব ডিটেইল ছিল যা মূল ঝাপসা ছবিটিতে ছিলই না।
স্যামসাং এ প্রযুক্তিকে ‘ডিটেইল এনহ্যান্সিং ফাংশন’ বা মানোন্নয়ন প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে এর পেছনের মূল কারিগর হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। অর্থাৎ স্যামসাং তার এআইকে হাজার হাজার চাঁদের ছবি দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ক্যামেরা যখনই বুঝতে পারে যে লেন্সের সামনে চাঁদ আছে, তখন সে অস্পষ্ট অংশগুলো নিজে থেকেই পূরণ করে দেয়।
স্যামসাংয়ের এক মুখপাত্র বলেন, এআইভিত্তিক ফিচারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন ছবির মান উন্নত হলেও এর স্বকীয়তা বজায় থাকে। তবে তার ভাষায়, ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী এআই ফিচার বন্ধ রাখার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারকারীর হাতেই থাকে।
স্মার্টফোন ফটোগ্রাফির এ বিবর্তনকে শুধু বিতর্ক হিসেবে না দেখে এর একটি ইতিবাচক ও একইসঙ্গে গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিকও তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। একসময় যা দক্ষ আলোকচিত্রীদের আয়ত্তে ছিল, এখন তা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে। নিউইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটির ডিজিটাল কালচার ও মিডিয়ার অধ্যাপক লেভ ম্যানোভিচ এ পরিবর্তনকে দেখছেন একটি ‘স্বয়ংক্রিয় বিপ্লব’ হিসেবে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তি মানুষের ছবিগুলো অনেক বেশি দৃষ্টিনন্দন এবং পেশাদার করছে সত্য, কিন্তু একইসঙ্গে তা মানুষের অজান্তেই বাস্তবতাকে বদলে দিচ্ছে। যখন কোনো বিশেষ মুহূর্তের ছবি তোলা হয় তখন ফোন নিজেই ঠিক করে দিচ্ছে সেই স্মৃতির রং কতটা গাঢ় হবে বা তার আলো কেমন হবে। অধিকাংশ সময় ব্যবহারকারী টেরও পান না যে তার অজান্তেই ছবিটির ওপর বড় ধরনের শৈল্পিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
The post বাস্তব ছবি নাকি ডিজিটাল বিভ্রম? appeared first on Techzoom.TV.

0 Comments