বাংলাদেশে স্মার্টফোনের চাহিদা এখন এক কথায় বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। যোগাযোগ, শিক্ষা, ব্যবসা, আর্থিক লেনদেন—জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আজ মোবাইল ফোন অপরিহার্য। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর যাত্রায় এটি নাগরিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭ কোটিরও বেশি। এই বিশাল বাজারকে ঘিরে দেশে গড়ে উঠেছে একটি সমৃদ্ধ স্থানীয় মোবাইল উৎপাদনশিল্প, যেখানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে, সৃষ্টি হয়েছে কয়েক হাজার কর্মসংস্থান।
কিন্তু এই অগ্রযাত্রার মাঝেই নীরবে বেড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অনিয়মের দানব—অবৈধ হ্যান্ডসেট সিন্ডিকেট। শুল্ক ফাঁকি ও পাচারের মাধ্যমে তারা বাজারে অবৈধভাবে ফোন এনে বিক্রি করছে। ফলাফল—রাষ্ট্র হারাচ্ছে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব, স্থানীয় শিল্পখাত হারাচ্ছে প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা, আর বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের মাধ্যমে অর্থনীতি পড়ছে ঝুঁকিতে।
শুল্ক ফাঁকির ভয়াবহ চিত্র
বর্তমানে মোবাইল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও ট্যাক্সের পরিমাণ প্রায় ৫৭ শতাংশ। বৈধভাবে আমদানিকারকদের এই কর পরিশোধ করতে হয়, যা রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি বড় উৎস। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ‘গ্রে মার্কেট’-এর মাধ্যমে অবৈধভাবে হ্যান্ডসেট এনে বাজারে বিক্রি করছে—কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই, কোনো সরকারি হিসাব নেই, অথচ বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যে। এরা সাধারণত দুইভাবে কাজ করে, বিদেশ থেকে হ্যান্ডসেট আমদানির সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল HS কোড ব্যবহার করে কম শুল্ক পরিশোধ করে। বিপুল পরিমাণ হ্যান্ডসেট যাত্রীদের লাগেজ বা পার্সেল কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশে ঢুকছে, যা কাস্টমস স্ক্যানের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের হিসেবে, দেশে বিক্রি হওয়া প্রতি চারটি স্মার্টফোনের মধ্যে একটি আসে অবৈধ পথে। অর্থাৎ রাষ্ট্র বছরে হারাচ্ছে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। এই অর্থে নতুন হাসপাতাল, বিদ্যালয় বা প্রযুক্তি ইনকিউবেশন সেন্টার গড়ে উঠতে পারত—কিন্তু তা হারিয়ে যাচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর পকেটে।
ডলার পাচার ও অর্থনীতির গভীর ক্ষত
এই অবৈধ ব্যবসা কেবল রাজস্ব ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন ডলার পাচারের এক গোপন চ্যানেলে পরিণত হয়েছে। বিদেশি সাপ্লায়ারদের সঙ্গে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’ বা ‘হুন্ডি’ পদ্ধতিতে লেনদেন করে এই সিন্ডিকেট বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যায়। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়ে, বৈধ লেনদেনের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, আর সামষ্টিক অর্থনীতি হারায় ভারসাম্য।
এটি শুধুমাত্র মোবাইল বাজার নয়, বরং দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্যও বিপজ্জনক। ডলার সংকটের এই সময়ে, এমন অবৈধ অর্থপ্রবাহ দেশের অর্থনীতিতে এক প্রকার ছিদ্র তৈরি করছে—যেখান দিয়ে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
স্থানীয় শিল্পের অস্তিত্ব হুমকির মুখে
২০১৭ সালে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন উৎপাদনের যাত্রা শুরু হয়। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশীয় ও বিদেশি মিলিয়ে ১৭টি কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা, কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো তরুণ তরুণীর। এই শিল্প এখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর।
কিন্তু অবৈধ হ্যান্ডসেট সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে এই শিল্প এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। বৈধভাবে উৎপাদিত ফোনের দাম কর ও শুল্কের কারণে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি পড়ে, কিন্তু অবৈধভাবে আমদানি করা ফোন কম দামে বাজারে আসায় বৈধ ব্র্যান্ডগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ আসছে না, কারখানার উৎপাদন কমছে, কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে—এ যেন এক নীরব ধস।
গ্রাহকও ক্ষতির শিকার
অবৈধ ফোন কিনে ক্রেতারা সাময়িকভাবে হয়তো কয়েক হাজার টাকা বাঁচাচ্ছেন, কিন্তু তারা নিজের অজান্তে একাধিক ঝুঁকি নিচ্ছেন। এসব ফোনের কোনো সরকারি রেজিস্ট্রেশন থাকে না, তাই হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে সেট শনাক্ত করা যায় না। নিরাপত্তা ও সফটওয়্যার আপডেটের অভাবে ব্যক্তিগত ডেটা চুরির ঝুঁকি বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নেটওয়ার্কে সমস্যা হয় বা ভবিষ্যতে NEIR সিস্টেম চালু হলে ফোনটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
অর্থাৎ, গ্রাহক নিজের টাকায় নিজের ক্ষতি কিনছেন।
দায় ও দায়িত্ব
এই পরিস্থিতির জন্য কেবল ব্যবসায়ীদের দোষ দিলে চলবে না। প্রশাসনিক দুর্বলতা, নজরদারির ঘাটতি এবং জনসচেতনতার অভাব—সব মিলিয়েই এই সংকট সৃষ্টি করেছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে স্ক্যানিং ও ডিক্লারেশন যাচাইয়ে আরও কঠোর করতে হবে। বিটিআরসিকে NEIR সিস্টেমকে ১০০% কার্যকর করতে হবে, যেন অবৈধ IMEI যুক্ত ফোন কোনো নেটওয়ার্কে সক্রিয় হতে না পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ ফোন বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে।
আর গ্রাহক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে—ফোন কেনার আগে IMEI যাচাই করা এখন নাগরিক দায়িত্ব।
অবৈধ ব্যবসায়ীদের বৈধ পথে ফেরার সুযোগ
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—যারা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তারা সবাই অপরাধী নয়; অনেকেই সঠিক পথ জানেন না বা সহজ অনুমোদন পদ্ধতির অভাবে অবৈধ পথে গিয়েছেন। তাদের জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত একটি “বৈধতায় ফিরুন” প্রোগ্রাম চালু করা।
এর মাধ্যমে:
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবৈধ আমদানিকারকরা তাদের ব্যবসা নিবন্ধন করে আইনসঙ্গত পথে আসতে পারবেন। ট্যাক্স ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সহজ ও ডিজিটাল করলে বৈধ ব্যবসায় আসা আকর্ষণীয় হবে। সরকার চাইলে ছোট বা মাঝারি আমদানিকারকদের জন্য ‘ওপেন লাইসেন্স’ ব্যবস্থা রাখতে পারে, যাতে তারাও বৈধ চ্যানেলে ব্যবসা চালাতে পারেন। বিটিআরসি ও এনবিআর যৌথভাবে ‘স্মার্ট রেজিস্ট্রেশন পোর্টাল’ চালু করতে পারে—যেখানে কয়েকটি ক্লিকেই আমদানি অনুমোদন, শুল্ক পরিশোধ ও ট্র্যাকিং সম্ভব হবে। এইভাবে, অবৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য শাস্তির পাশাপাশি বৈধ পথে ফেরার দরজা খোলা রাখতে হবে। কারণ শাস্তি ভয় দেখাতে পারে, কিন্তু সহজ নীতি মানুষকে বদলাতে উৎসাহ দেয়।
নীতিগত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
বাংলাদেশ সরকার মোবাইল শিল্পকে ইতোমধ্যেই ‘উদীয়মান খাত’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। কর ছাড়, স্থানীয় ভ্যালু অ্যাডিশন, এমনকি রপ্তানির সুযোগ—সবই আছে। কিন্তু এই সুযোগগুলো তখনই কাজে লাগবে, যখন বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা থাকবে। এখনই সময় একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করার, যেখানে কাস্টমস, এনবিআর, বিটিআরসি, পুলিশ, ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একসঙ্গে কাজ করবে। সেইসঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ই-কমার্স সাইটগুলোকেও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, কারণ অবৈধ ফোন বিক্রির বড় অংশ হচ্ছে অনলাইনে।
শেষ কথা
স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে মোবাইল শিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়—এটি এক কৌশলগত জাতীয় সম্পদ। এই শিল্পের সুরক্ষা মানে রাজস্ব সুরক্ষা, কর্মসংস্থান সুরক্ষা, এবং প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরতা নিশ্চিত করা।
অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট সিন্ডিকেট সেই স্বপ্নকে ধ্বংস করছে নীরবে। এখন সময়—রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—তিন পক্ষের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের। রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে, ব্যবসায়ীকে বৈধ পথে ফিরতে হবে, আর ক্রেতাকে সচেতন হতে হবে।
কারণ অবৈধ হ্যান্ডসেট শুধু একটি ফোন নয়—এটি দেশের রাজস্ব, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি আঘাত। এখনই সময়—অবৈধকে না বলে বৈধ ব্যবসাকে শক্তিশালী করার।
The post অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট সিন্ডিকেট: অর্থনীতি, শিল্প ও ন্যায্য ব্যবসার ওপর দ্বিমুখী আঘাত appeared first on Techzoom.TV.

0 Comments